মানুষের এই বিবর্তনের পথে ঈশ্বরের উৎপত্তি কোথায় থেকে ! কুরআনের মতে- সৃষ্টিতত্ত্ব

মানুষের এই বিবর্তনের পথে ঈশ্বরের উৎপত্তি কোথায় থেকে !
কুরআনের মতে- সৃষ্টিতত্ত্ব
পূর্বে আলোচিত গ্রীক, হিন্দু পৌরাণিক গ্রন্থসমূহ বা বাইবেলের মতো- কুরআনে কোন তথ্যাবলী উপস্থাপনেই ধারাবাহিকতা রক্ষিত হয় নি। মূলত আল্লাহর স্বরূপ, আল্লাহর প্রতি মানুষের আনুগত্য, সহজ ও সরল পথ অনুসরণে মানুষের জীবন-যাপনের ধারা ইত্যাদি সম্পর্কিত নির্দেশাবলী কুরআনের বিষয়। তাত্ক্ষণিকভাবে উক্ত প্রেরিত বাণী ছিল- তত্কালীন আরববাসীদের জন্য। কিন্তু এই বাণী এমনভাবে পরিবেশন করা হয়েছিল- যাতে করে আগামী দিনের সকল ভূখণ্ডের মানুষও দিক নির্দেশনা পেতে পারে। এই নির্দেশনার অনুসঙ্গ বা উদাহরণ হিসাবে দেওয়া হয়েছে বিভিন্ন সহায়ক তথ্যাবলী। 

সূরা আরফ। আয়াত ৫৪
৫৪ নিশ্চয়ই তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহ। তিনি নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলকে ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন।….

এখান সমগ্র বিশ্বচরাচর ৬ দিনে সৃষ্টির কথা বলা হয়েছে। এই হিসাবটি বাইবেলের সাথে মিলে যায়। কিন্তু এই আয়াতে ৬ দিনের সৃষ্টিকে দুটি ভাগে ভাগ করেছে। একটি ভাগ নভোমণ্ডল- অর্থাৎ মহাকাশ ও এর সকল উপকরণ (গ্যালাক্সি ও মহাকাশীয় অন্যান্য উপকরণ)। দ্বিতীয় ভাগে সৃষ্টি করছেন ভূমণ্ডল- অর্থাৎ পৃথিবী। এখানে একটি বিষয় লক্ষ্য করুন এখানে অধিকাংশ অনুবাদক দিন শব্দ ব্যবহার করেছেন। সেই কারণে আমিও দিন ব্যবহার করেছি। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এই দিন বলতে কি বুঝানো হয়েছে সেটিও ভাববার বিষয়।

এখানে পার্থিব দিনের হিসাব গ্রহণ করা যাবে না। কারণ, সৃষ্টির আদিতে যখন পৃথিবী- সূর্য তৈরি হয় নি তখন-পার্থিব দিনের বিষয়টি আসতে পারে না। আপনার হয়তো অনেকেই জানেন যে- আরবী ইয়াওম শব্দের অর্থ দিন। কিন্তু উক্ত আয়াতে ব্যবহার করা হয়েছে আইয়াম। উল্লেখ আইয়াম হলো ইয়াওম শব্দের বহুবচন- অর্থাৎ দিবসসমূহ। এখানে আক্ষরিক দিবসসমূহ অর্থ গ্রহণ না করে এর অর্থ গ্রহণ করা উচিৎ কাল, পর্যায়, যুগ ইত্যাদি অর্থে। সে হিসাবে এই আয়াতের অনুবাদ হওয়া উচিত্ ….তিনি নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলকে ছয় কালে (পর্যায়ে বা যুগে) সৃষ্টি করেছেন।

কুরআনে বর্ণিত এই ছয় মহাকালের মধ্যে আল্লাহ কোন পর্যায় কি তৈরি করেছেন, তা পাওয়া যায়- সূরা হা-মীম সেজদাহ-তে।

সূরা হা-মীম সেজদাহ। আয়াত ৯-১১
৯ বলুন, তোমরা কি সে সত্তাকে অস্বীকার কর যিনি পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন দুদিনে এবং তোমরা কি তার সমকক্ষ স্থির কর? তিনি তো সমগ্র বিশ্বের পালনকর্তা।
১০ তিনি পৃথিবীতে উপরিভাগ অটল পর্বতমালা স্থাপন করেছেন, তাতে কল্যাণ নিহিত রেখেছেন এবং চার দিনের মধ্যে তাতে তার খাদ্যের ব্যবস্থা করেছেন- পূর্ণ হল জিজ্ঞাসুদের জন্য।
১১ অতঃপর তিনি আকাশের দিকে মনোযোগ দিলেন যা ছিল ধুম্রকুঞ্জ……

এই সুরায় উল্লেখিত দুই দিন নিয়ে অনেক অনূবাদক বা সমালোচক বিভ্রান্তিতে পতিত হন। লক্ষ্য করুন সূরা আরফ-এর ৫৪ আয়াত ছয়টি পর্যায়ে নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডল সৃষ্টির কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ এখানেই সমগ্র ছয়টি পর্যায়কে দুটো ভাগে ভাগ করা হয়েছে। এর একটি হলো-নভোমণ্ডল সৃষ্টি কাল অপরটি ভূমণ্ডল সৃষ্টিকাল। এই দুটি পর্যায়ের প্রথমেই নভেমণ্ডল তৈরি করার সময়ই পৃথিবী তৈরি হয়ে গেছে। বিশ্বচরাচরের প্রাথমিক বিন্যাসে আল্লাহ মাত্র দুটি সময়-পর্যায় ব্যয় করেছেন। ফলে ৬টি পর্যায়ের মধ্যে চারটি পর্যায় অবশিষ্ট থেকে যায়। এই কারণে সূরা হা-মীম সেজদাহ ৯ আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে -যিনি পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন দুদিনে।

বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে ১৫০০-১০০০ কোটি বত্সরের মধ্যে গ্যালাক্সিগুলোর বিন্যাস হয়েছিল বটে কিন্তু সুবিন্যাস্ত ছিল না। কিন্তু ৫০০ কোটি বত্সরের মধ্যে যখন সূর্য, পৃথিবী ইত্যাদি তৈরি হয়েছিল, তখন মহাকাশেও তেমনি প্রক্রিয়া চলছিল। এই পর্যায়ে কিছু কিছু নক্ষত্র তৈরির প্রক্রিয়া চলতে থাকলেও তাদের অধিকাংশই তখন গ্যাসীয় অবস্থাতেই ছিল। কুরআনের মতে- মহাকাশের এই পরিবর্তনের সূচনা করলেন আল্লাহ। এবং কুরআনের মতে- আল্লাহ এই ধুম্রকুঞ্জের দিকে নজর দিলেন। অর্থাৎ ধুম্রকুঞ্জকে বিভিন্ন মহাকাশীয় অবজেক্টে পরিণত করলেন। সৃষ্টির এই পর্যায়ে যখন আকাশ মণ্ডলের দিকে আল্লাহ নজর দিলেন- তখন মহাকাশকে সম্প্রাসরণ ও পৃথিবীকে বিস্তৃত করেছেন। বিষয়টি সূরা আন্-নাযিআত-এ যেভাবে বলা হয়েছে, তা হলো-

সূরা আন্-নাযিআত। আয়াত ২৭-৩০
২৭ তোমাদের সৃষ্টি অধিক কঠিন না আকাশের, যা তিনি নির্মাণ করেছেন?
২৮ তিনি একে উচ্চ করেছেন ও সুবিন্যস্ত করেছেন।
২৯ তিনি রাত্রিকে করেছেন অন্ধকারাচ্ছন্ন এবং এর সূর্যালোক প্রকাশ করেছেন।
৩০ পৃথিবীকে এর পরে বিস্তৃত করেছেন।

এই ছয়টি পর্যায়ের ভিতরই মহাকাল সম্প্রসারিত হওয়ার কথা। নাকি মহাজাগতিক বিগব্যাং-এর পরে কিছু সময় এই সম্প্রসারণ স্তিমিত বা থেমে গিয়েছিল কি? এবং পরে এর সম্প্রসারণের প্রক্রিয়া চালু হয়েছিল? এই জাতীয় প্রশ্নটি উঠতেই পারে। কোন একটি বিশাল বিস্ফোরণের পর, কেন্দ্রে যে শূন্যতার সৃষ্টি হয়, তার প্রতিক্রিয়ায় এই স্থবিরতা নেমে আসতেই পারে।

উপরের ধর্মীয় মতাদর্শগুলো বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি সম্পর্কে ইঙ্গিত দিয়েছে মাত্র। এই ইঙ্গিতকে বিনা দ্বিধায় বিশ্বাস করে নিতে হবে- এমন কঠোর নির্দেশই প্রদান করা হয়েছে। এই নির্দেশ মানতে গিয়ে সত্য রক্ষিত হবে কিনা তা বিবেচ্য নয়। যে ক্ষেত্রে ধর্মীয় এই বিশ্বাসের সাথে সত্যানুসন্ধানের ঐক্য হবে- সেখানে ধর্মবাদীরা ধর্মের সত্যনিষ্ঠ শক্তির কথা সগৌরবে প্রচার করেন। কিন্তু যেখানে এই সত্য লঙ্ঘিত হয়- সেখানেই সৃষ্টি হয় সত্যের সাথে ধর্মীয় বিশ্বাসের সংঘাত। যেমন, খ্রীষ্টান-পুরোহিতদের সাথে গ্যালিলিওর মতবাদের সংঘাত।

মূলত ধর্মীয় দর্শনের সাথে সংঘাতের সূত্রপাত ঘটে বিজ্ঞানের আলোকময় পথে। প্রশ্ন হলো বিজ্ঞান কি সর্বদা অভ্রান্ত। না তেমনটি ভাবার কোন কারণ নেই। কিন্তু বিজ্ঞানের বিকাশ ঘটে চলে, ত্রুটি সংশোধনের ক্রমধারার মধ্য দিয়ে। কিন্তু ধর্মীয় বয়ানকে গোড়া থেকে অভ্রান্ত ও চিরন্তন হিসাবে ধরে নেওয়া হয়। এর কোন অংশ সংশোধন করতে গেলেই- ধর্মের এই চির সত্যের প্রাসাদ ভেঙে পড়ে। তাই বিজ্ঞানীরা যেখানে প্রতিনয়ত নিষ্ঠার সাথে সত্যের কাছে পৌছার জন্য নিজেদের সত্যকেই অগ্রাহ্য করে নূতন সত্যকে উপস্থাপন করে। সেখানে ধর্মীয় পুরোহিতরা মিথ্যা জেনেও পুরানো ধারণাকে নিষ্ঠার সাথে রক্ষা করার চেষ্টা করেন।

Comments

Popular posts from this blog

আপনি যদি প্রশ্ন করেন, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় আলেম কে ?

*****নামাজ*****Namaz*****

#নামাজে মন ফিরানো